
মোঃ সামিউল ইসলাম,স্টাফ রিপোর্টার:
গাইবন্ধায় কারাবন্দী অবস্থায় পলাশবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মহিলা ডিগ্রি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল সামিকুল ইসলাম লিপনের মৃত্যুর পর এলাকায় বইছে আলোচনার ঝড়। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তার একক আধিপত্যের নিচে পিষ্ট হওয়া মানুষগুলো এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন। বেরিয়ে আসছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সাংবাদিকদের হয়রানি এবং নিয়োগ বাণিজ্যের ভয়াবহ সব অভিযোগ।
সাংবাদিকদের ওপর আইসিটি আইনের খড়গ ক্ষমতার দাপটে সামিকুল ইসলাম লিপন শুধু বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরই নয়, কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিলেন স্থানীয় সাংবাদিকদেরও। আইসিটি (ডিজিটাল নিরাপত্তা) আইনে মামলা দিয়ে হয়রানি করেছিলেন তিন কলমযোদ্ধাকে। তারা হলেন— পলাশবাড়ী প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সহসভাপতি দৈনিক সংগ্রামের উপজেলা প্রতিনিধি ফেরদাউছ মিয়া, দৈনিক দিনকালের সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম কবির।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক ফেরদাউছ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই ভিত্তিহীন মামলার ঘানি টানতে গিয়ে আমার জীবনের সবচাইতে মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট হয়েছে। আমি শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছি। ৫/৬ লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি।
শুধু তাই নয়, আওয়ামীলীগের আমলে বিরোধীমতের কোনো ছেলে মেয়ের সরকারি চাকরি হলে সেই চাকরিতে তিনি বাগড়া দিতেন। তেমনই এক ভুক্তভোগী পলাশবাড়ী পৌরসভার বৈরীহরিনমারী গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, আমার বড় ছেলে শামীমের পুলিশের চাকরি হলে পুলিশ ভেরিফিশন করতে এলে, লিপন সেই পুলিশকে জানায় শামীমের পরিবার জামায়াত করে। ওকে চাকরি দেয়া যাবে না। তিনি আরো জানান, ছেলের চাকরিটা যাতে হয় সেই জন্য আমি লিপনের পায়ে পড়েছিলাম। কিন্তু তারপরও আমার ছেলের চাকরি হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধা-৩ আসনের সাবেক এমপি প্রয়াত ডা. ইউনুস আলীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে সামিকুল ইসলাম লিপন দ্রুত দাপট অর্জন করেন। মূলত এমপির আশীর্বাদ ও তদবিরেই তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদটি বাগিয়ে নেন। এরপর থেকে পলাশবাড়ী উপজেলার সব প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তার একক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
লিপনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, এই পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে তিনি উপজেলার অসংখ্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর অনেক চাকরিপ্রত্যাশী টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে খুঁজে পাননি।
কর্মজীবনে একটি মহিলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তার মূল পরিচিতি ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। ৫ আগস্টের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দী হন তিনি। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল(১৪ ফেব্রুয়ারী-২৬) তার মৃত্যু হয়। তার প্রয়াণে একদিকে যেমন একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে, অন্যদিকে তার হাতে নির্যাতিত হওয়া সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের ক্ষোভ এখনও প্রশমিত হয়নি।