
মোঃমামুন হোসেন,ঢাকা ব্যুরো প্রধান:
শুকনো মৌসুমে ধুলোবালির রাজ্যে পরিণত হয়েছে শিল্পাঞ্চল সাভারের আশুলিয়া। বেড়েছে বায়ুদূষণের মাত্রা কয়েকগুণ। শীতের কুয়াশার মতো ধুলায় আচ্ছাদিত সড়ক। চলন্ত যানবাহনের পেছনে কুণ্ডলি পাকিয়ে বাতাসে উড়ছে ধুলাবালু। সড়কের দুই পাশের দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর ধুলায় সয়লাব। সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা না বাড়লে অদূর ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য চরম হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যবিদ ও পরিবেশবিদরা।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তায় নেমেই নাকাল হচ্ছেন পথচারীরা। নাক-মুখ ও চোখে ধুলা ঢুকে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম। দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে জনজীবন। দূষিত পরিবেশে বাড়ছে নানা রোগবালাই। বিশেষ করে অ্যাজমা, অ্যালার্জি, কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চেম্বারে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।
আশুলিয়ার বাইপাইল থেকে আব্দুল্লাহপুর সড়কটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়ক। ঢাকা থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াতের প্রধান সড়ক এটি। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে হাজারো পণ্যবাহী যান, গণপরিবহন ও সাধারণ মানুষ চলাচল করে। এ সড়কের ওপর দিয়েই নির্মাণাধীন ঢাকা–আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ফলে ভবিষ্যতে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলেও বর্তমানে ভোগান্তির শেষ নেই। সড়ক সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে, তীব্র যানজট ও অতিরিক্ত ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ ও পথচারীরা। কাজ চলাকালীন নিম্নমানের মেরামত ও সংস্কারের কারণে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গণপরিবহনের যাত্রীরাও ধুলায় নাকাল। গায়ের পোশাক ও চুল ধুলায় বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। সড়কের পাশের শোরুম, খাবারের দোকান, হোটেল ও রেস্তোরাঁ ধুলাবালিতে একাকার। আশপাশের ভবন ও গাছপালায় জমেছে ধুলার আস্তরণ। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সড়কে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা, ভ্যানগাড়ি ও রিকশাচালকসহ গণপরিবহনের চালক ও যাত্রীরা।
পথচারী ও ব্যবসায়ীদের দাবি, সড়কে নিয়মিত পানি ছিটানো হচ্ছে না। প্রতিদিন পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করলে কিছুটা স্বস্তি মিলবে বলে তারা মনে করেন।
টাঙ্গাইল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রতিষ্ঠাতা মো. আব্দুল লতিফ বলেন, ‘ধুলাবালির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, শিক্ষার্থীরাও নানা অসুখে ভুগছে।’
ঢাকা–আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে বাইপাইল–আব্দুল্লাহপুর মহাসড়কে প্রতিদিন ট্রাকে করে পানি ছিটানো হচ্ছে কি না—এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ধুলাবালির প্রভাব কমাতে ও জনসচেতনতা বাড়াতে মাস্ক বিতরণ করেছেন আশুলিয়া থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হাবিব। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাস্ক ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।
গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রফেসর ডা. শাকিল মাহমুদ বলেন, ‘বায়ুদূষণের মারাত্মক শিকার হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। এ সময়ে শিশুদের অ্যাজমাসহ শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বাড়ছে। আমাদের কাছে রোগী আসার হার আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে শীত মৌসুমে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এইচ এম সাদাত বলেন, ‘অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়ি, উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি এবং সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় ধুলাবালিতে এমন দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যানবাহন ও কলকারখানার কালো ধোঁয়া। বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ পরিবহন ও নির্মাণকাজ।’
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সড়কে সকাল-সন্ধ্যা পানি না ছিটালে সাভার উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু বলেন, ‘পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা পেতে সাভার ও আশুলিয়াকে ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন হিসেবে গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।’