
মোঃ নূরেআলম রায়হান,কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি:
ঢাকার কেরানীগঞ্জের আটিবাজার কুলচর গ্রামে গৃহবধূ তানহা আক্তার লামিয়ার রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়,পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
পশু-পাখি আর প্রকৃতিপ্রেমী শান্ত স্বভাবের তরুণী তানহা আক্তার লামিয়া (২০) পড়াশোনার পাশাপাশি নিজ হাতে গড়ে তোলা একটি ছোট খামারের হাঁস-মুরগি ও পাখি নিয়ে সময় কাটাতেন। বড় বোনের বিয়ের পর পরিবারে থেকেই কলেজে যাতায়াত করতেন তিনি। তবে কলেজে আসা-যাওয়ার পথে স্থানীয় ইন্টারনেট ব্যবসায়ী তানভীর আহমেদের সঙ্গে পরিচয় ও প্রেমের সূত্র ধরে তার জীবন আমূল বদলে যায়।
পারিবারিক অমতে ঘর ছেড়ে তানভীরকে বিয়ে করলেও, বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই সেই সম্পর্ক হয়ে ওঠে ভয়াবহ নির্যাতনের এক অদৃশ্য কারাগার। অভিযোগ রয়েছে, তানভীর তার বাসায় প্রায় ১৬টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে সার্বক্ষণিক তানহার ওপর নজরদারি চালাতেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ তো দূরের কথা, কারও সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার সুযোগও তার ছিল না।
তানহার বাবা ভুলু মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,বিয়ের পর থেকেই আমার মেয়েকে ওরা জিম্মি করে রেখেছিল। ভালোবাসার কথা বলে বিয়ে করে মানসিক নির্যাতন চালিয়েছে। ১৬টা ক্যামেরার নজরদারিতে থাকা ঘরে কীভাবে কেউ আত্মহত্যা করে? এটা স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড। আমরা ন্যায়বিচার চাই।
মা আয়েশা বেগম বলেন,যে মেয়ে পশুপাখি ভালোবাসে, সে নিজের জীবন শেষ করে দেবে,এটা বিশ্বাসযোগ্য না। টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে নির্যাতন করা হতো। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে মারধর করত। পুলিশ বলছে অপমৃত্যু, কিন্তু আমরা জানি ওকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
শোবার ঘরেও ক্যামেরা কেন তানহার বড় বোন ও দুলাভাই সোহান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,তানভীরের অবিশ্বাস এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, শোবার ঘরেও ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। এটা কি কোনো স্বাভাবিক মানুষের আচরণ? পুলিশ আমাদের ‘মিউচুয়াল’ করতে বলছে,কিন্তু জীবনের কি কোনো মিউচুয়াল হয়?
তাদের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজগুলো সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে।
প্রতিবেশীদের বক্তব্য
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তানহা এলাকায় একজন শান্ত ও পশু-পাখিপ্রেমী মেয়ে হিসেবেই পরিচিত ছিল। বিয়ের পর থেকে তাকে আর আগের মতো দেখা যেত না। তানভীরের বাসায় অতিরিক্ত সিসি ক্যামেরা থাকায় বিষয়টি এলাকাবাসীর কাছেও অস্বাভাবিক মনে হতো।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাইফুল আলম জানান,ঘটনার পর একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। রিপোর্ট হাতে পেলেই মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একটি তরুণ জীবনের এমন করুণ পরিণতিতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এখন সবার দৃষ্টি ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও নিরপেক্ষ তদন্তের দিকে,তানহা কি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি ডিজিটাল কারাগারে বন্দী হয়েই প্রাণ হারিয়েছেন?